বিহার নির্বাচন ও ভোটার তালিকা সংশোধন: প্রান্তিক মানুষদের অধিকার সংকটে

Photo of author

By itscanvacreation

কাজি শেরিফ

বিহারের বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কার্যকাল শেষ হতে চলেছে, স্বাভাবিকভাবেই বিধানসভা নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে, নির্বাচন কমিশন বিহার নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতিও শুরু করেছেন। প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হচ্ছে ভোটার তালিকায় প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা। অভিযোগ নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রস্তুতির নামে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ নামের আড়ালে এক নয়া পদ্ধতি অবলম্বন করে কার্যতঃ প্রান্তিক মানুষদের যাবতীয় অধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন যার ফলে ভারতের প্রতিনিধিত্ব মূলক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বুনিয়াদ ধ্বসে পড়তে চলেছে। নির্বাচন কমিশনের এহেন কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এখন বিহারের সীমারেখা অতিক্রম করে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ভারতীয় গণতন্ত্র এখন এক গভীর সংকটের আবর্তে।


গুপ্ত যুগে সমাজের উচ্চ বর্ণের মানুষ প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ দের শূদ্র নামে অভিহিত করে সমাজের অধিকার বিহীন অপাংক্তেয় অংশে পরিণত করেছিল। গভীর লজ্জার বিষয় হচ্ছে যে সেই সমাজ ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক শাসন কাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পেরেছিল।
প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষদের সমান অধিকারের দাবীতে ভারতে প্রথম সোচ্চার হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্ৰেস।


১৯২৮ সালের নেহেরু রিপোর্টে এক যুগান্তকারী প্রস্তাবে ধনী-নির্ধন, উচ্চ-নীচ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার এবং সকল প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের ভোটাধিকারের দাবি প্রথম উত্থাপিত হয়। বলাবাহুল্য গেরুয়া শিবির এই দাবি সমর্থন করেনি। মনুসংহিতা নির্দেশিত চতুঃস্তরীয় সামাজিক কাঠামোর সর্বনিম্ম স্তরে স্থান দেওয়া হয়েছে শূদ্র বর্ণভুক্ত মানুষদের। ঐ সামাজিক কাঠামোতে শূদ্র শিক্ষা ও স্বাধীন চিন্তার সূযোগ বর্জিত সর্ববিধ অধিকার বঞ্চিত এক গোষ্ঠী যাদের পূজা অর্চনার অধিকারও দেওয়া হয়নি, শূদ্রদের পার্থিব জীবন উচ্চ বর্ণের মানুষদের সেবার জন্যই উৎসর্গীকৃত। হিন্দুত্ব তত্ত্বের অন্যতম অবলম্বন মনুসংহিতা ।


জাতীয় কংগ্ৰেস নেহেরু রিপোর্টকে গ্ৰহণ করে যুগ যুগান্তর থেকে দলিত শূদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষদের জন্য চলে আসা অত্যাচারের বিরোধীতা এবং শূদ্র মানুষদের সমানাধিকারের ব্রত গ্ৰহণ করে ভারতীয় ইতিহাস এবং রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল। বলাবাহুল্য পরষ্পর বিরোধী হিন্দু জাতীয়তাবাদ তত্ত্ব এবং জাতীয় কংগ্ৰেসের উদার সমানাধিকার তত্ত্বের বিরোধ পরবর্তী কালের ভারতীয় রাজনীতিকে গভীর ভাবে প্রভাবান্বিত করেছে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশের সংবিধান রচনা কালেও নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার এর প্রসঙ্গে তুমূল বিতর্ক হয়েছিল । এমনকি ভারতে নাগরিকত্বের অধিকার কেবলমাত্র হিন্দু এবং শিখ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমিত রাখার জোরালো দাবিও গণ পরিষদে তোলা হয়েছিল। কিন্তু গণ পরিষদে জাতীয় কংগ্ৰেসের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সে সব দাবি নস্যাত করে জহরলাল নেহেরু, আম্বেদকর, মৌলানা আজাদ, সর্দার প্যাটেল ইত্যাদি জাতীয় নেতাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জাতি -ধর্ম, উচ্চ-নীচ, ধনী-নির্ধন, শূদ্র-ব্রাম্ভন নির্বিশেষে ভারত ভূমিতে জন্মগ্ৰহণ এবং তৎকালে বসবাস কারী প্রত্যেককেই সমান নাগরিক মর্যাদার অধিকার দানের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতি ক্রমে গ্ৰৃহীত হয়। একই সঙ্গে প্রাপ্ত বয়স্ক (সেই সময়ে একুশ বছর বয়স) সকল নাগরিকের জন্য সমান ভোটাধিকার এর সিদ্ধান্ত গ্ৰৃহীত হয় । তৎকালে ভারতীয় গণপরিষদের ঐ সিদ্ধান্ত ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা কারণ ইউরোপের উন্নত দেশগুলির অনেক গুলিতেই প্রান্তিক মানুষ এবং মহিলাদের ভোটাধিকার তখনো স্বীকৃত হয়নি।
সংবিধানে ভিনদেশে জন্মগ্ৰহণকারি মানুষ দেরও রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদানের সংস্থান রাখা হয়। এছাড়াও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গণ পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করে যে ভারত ভূমিতে জন্মগ্ৰহণকারি প্রত্যেক মানুষ জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক বলে গণ্য হবেন ।


নাগরিকত্বের অধিকার হিন্দু জাতীয়তাবাদ তত্ত্বের এক অচ্ছেদ্য অঙ্গ হওয়ার জন্য হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের কাছে নাগরিকত্বের প্রশ্ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু জাতীয়তাবাদ তত্ত্ব অনুযায়ী পৌরাণিক যুগেই ভারতে এক হিন্দু জাতি গঠিত হয়েছিল এবং কেবল মাত্র সেই কল্পিত হিন্দু জাতির সন্তান – সন্ততিদের মধ্যে যারা স্বধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম , খ্রীষ্টান ইত্যাদি ধর্ম গ্ৰহণ করেন নি তারাই উত্তরাধিকার সূত্রে ভারতীয় নাগরিক হিসাবে গণ্য হতে পারেন। ফলে দেশের মাটিতে জন্মগ্ৰহনের সূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার গেরুয়া পন্থীদের কোনক্রমেই মনঃপুত না হলেও অনন্যোপায় হয়ে তখন মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।


১৯৫৫ সালে ভারতে সাংবিধানিক নির্দেশ এর পূর্ণ মর্যাদা রক্ষা করে আইন পরিষদের অনুমোদন ক্রমে নাগরিকত্ব আইন- ১৯৫৫ গ্ৰৃহীত হয় যার ফলে ভারত ভূমিতে জন্মগ্ৰহণকারি প্রত্যেকেই ভারতীয় নাগরিক এর মর্যাদা প্রাপ্ত হয়।ভারতীয় সংবিধান ভারতের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক কে লোকসভা এবং বিধানসভার নির্বাচনের জন্য ভোট প্রক্রিয়ায় অংশগ্ৰহণের অধিকার দান করেছে এবং সুষ্পষ্ট ভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে একমাত্র প্রাপ্ত বয়স্ক ভারতীয় নাগরিকেরা ঐ সকল নির্বাচনে ভোট দানে অধিকারি। লোকসভা এবং বিধানসভার জন্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের কাজ নিরপেক্ষ ও পক্ষপাত শূণ্য পদ্ধতিতে সুসম্পন্ন করার জন্য সংবিধানে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং ভোট প্রক্রিয়া সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশ আছে। সংবিধানে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে প্রাপ্ত বয়স্ক কোন নাগরিকের নাম অযৌক্তিক কারণে ভোটার তালিকা থেকে বাদ না দেওয়ার জন্য।
১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতের তৎকালীন জনসংখ্যা ছিল ৩৬,১০,৮৮,০৯০ জন। বিপুল এই জনসংখ্যার মধ্যে সকল প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা ছিল এক প্রায় অসম্ভব কাজ। এই অসম্ভব কাজকে সুচারুরূপে সম্ভব করেছিলেন এক বাঙালি, সুকুমার সেন, ভারতের প্রথম মূখ্য নির্বাচন আধিকারিক।


গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতির প্রচলিত পদ্ধতি গুলিকে প্রধান দুই ভাগে ভাগ করা যায়। কিছু কিছু দেশে নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় ইচ্ছুক নাগরিকদের আবেদনের ভিত্তিতে। সমাজের অত্যন্ত পিছিয়ে থাকা অংশের মানুষদের রাজনৈতিক সচেতনতা সাধারণ ভাবে কম থাকায় এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে সেই পিছিয়ে থাকা অংশ বাদ পড়ে কারণ তাদের অনেকেই ভোট দানের জন্য ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করার উৎসাহ বোধ করেন না। খোদ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেও এখন অবধি এই পদ্ধতি অনুস্রৃত হয় এবং বহু নাগরিক ভোট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন না।


ভারতীয় সংবিধান সকল প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিককে ভোটদানের সমান অধিকার প্রদান করায় প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দায় এবং দায়িত্ব সরকার অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের উপর সাংবিধানিক কর্তব্য রুপে বর্তায়।
স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচনে মূখ্য নির্বাচন কমিশনারের আদেশানুসারে নির্বাচন কর্মিরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে সরেজমিনে দেখে প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির নাম তালিকাভুক্ত করেন তার পর সেই তালিকা খসড়া ভোটার তালিকা রুপে প্রকাশিত হয় যাতে তালিকাভুক্ত কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কোন অভিযোগ থাকলে অভিযোগ কারি অভিযোগ জানাতে পারে এবং ঐ অভিযোগের শুনানির সময় অভিযোগ কারি তথ্য প্রমাণ সহকারে ব্যক্তব্য পেশ করতে পারে। ঐ পদ্ধতি গ্ৰহণ করে নির্বাচন কমিশন ১৭,৩২,১২,৩৪৩ জন নাগরিকের নাম চুড়ান্ত ভোটার তালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিল এবং এই পদ্ধতি জনগণের সপ্রশংস সমর্থন পেয়েছিল।


তারপর থেকে প্রতিটি নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের কর্মিরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে আগের নির্বাচনের ভোটার তালিকার ম্রৃত্যু ইত্যাদি কারণে ঘটিত প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর খসড়া তালিকা প্রকাশ করে এবং তালিকায় সংযোজন বিয়োজন ইত্যাদি সংক্রান্ত আবেদন অভিযোগ শুনানির পর ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।


১৯৫১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিহারে ১৮ দফা লোকসভা নির্বাচন এবং ১৬ দফা বিধান সভার নির্বাচন হয়েছে।
বিহার সমেত দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ত্রুটি বিচ্যুতির ছোটখাটো অভিযোগও আগে অনেকবার উঠেছে। দেশে ভোট পদ্ধতিরও সংশোধন এবং পরিবর্তন হয়েছে অনেকবার, দেশে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ও উন্নয়ন হয়েছে দেশে ফলে ত্রুটি বিহীন ভোটার তালিকা তৈরি এখন নির্বাচন কমিশনের সাধ্যের মধ্যে।


ত্রুটি বিহীন ভোটার তালিকা তৈরির নামে নির্বাচন কমিশন যে নয়া পদ্ধতি অবলম্বন করতে চাইছে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলি তো বটেই সাধারণ মানুষ ও এখন সোচ্চারে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।


যে অভিযোগ গুলি নিয়ে সকলে এখন সোচ্চার এবং অনেকেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন সেগুলির মধ্যে প্রথমটি হল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী নামের আড়ালে নির্বাচন কমিশন সাবেক এবং চলতি ভোটার তালিকার বিলোপ ঘটিয়ে নূতন তালিকা তৈরি করতে চলেছে যার ফল স্বরূপ এমন সব সমস্যার স্রষ্টি হয়েছে যার সমাধান নির্বাচন কমিশনের সাধ্যের বাইরে।
দ্বিতীয় অভিযোগ ত্রুটি মুক্ত ভোটার তালিকা তৈরির নমে যে পদ্ধতি নির্বাচন কমিশন প্রয়োগ করতে যাচ্ছে তার ফলে ত্রুটি আরও ব্রৃদ্ধি পাবে। এযাবত যে ত্রুটি গুলি নিয়ে অভিযোগ উঠত সেগুলি হচ্ছে :


ক) এক ব্যক্তি কর্তৃক অন্য কোন এক বা একাধিক ব্যক্তির ভোট দেওয়া যাকে পশ্চিমবাংলায় সহজ কথায় জাল ভোট বা ছাপ্পা ভোট বলা হয়।
খ) ভুয়া ভোটার অর্থাৎ বাস্তব অস্তিত্ব বিহীন ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা,
গ) একই ব্যাক্তির একাধিক কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি এবং

ঘ) বৈধ ভোটারের নাম অবৈধভাবে ভোটার তালিকা থেকে বিলোপ করা।
ঙ) ভোট গণনার ক্ষেত্রে কারচুপি।


সচিত্র ভোটার আইডেন্টিটি কার্ড , বায়োমেট্রিক তথ্য সম্রৃদ্ধ আধার কার্ড এবং ইভিএম যন্ত্রের সঙ্গে ভিভিপ্যাট যুক্ত করার ফলে এখন প্রায় সবকটি সমস্যার প্রায় পুরোপুরি সমাধান সম্ভব। প্রতিটি বায়োমেট্রিক তথ্য সম্বলিত সচিত্র আধার কার্ডে একটি প্রৃথক এবং অনন্য সংখ্যা সংযোজিত থাকার ফলে একাধারে যেমন এক ব্যক্তির নামের একাধিক ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি রোধ করা যায় তেমনি ভুয়া ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় সংযোজন নিশ্চিত রুপে রোধ করা যায়। তেমনি সচিত্র ভোটার বা আধার কার্ড নিজ ভোট ছাড়া অপরের ভোট দেওয়া সফল ভাবে বন্ধ করতে পারে। আধার কার্ডের সঙ্গে ভোটার কার্ডের সংযুক্তির মাধ্যমে খুব সহজেই এখন উপরের প্রথম চারটি সমস্যার সমাধান সম্ভব।


ভিভিপ্যাট বা ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেল যন্ত্র এখন ইভিএম যন্ত্রে মূক্ত হওয়ার ফলে ভোট দাতার পক্ষে দেখা সম্ভব নিজের ভোটটি ঠিক যায়গায় পড়েছে কিনা এবং সেই ইভিএম ব্যালট গুলির শতকরা একশ ভাগ গোনার ব্যবস্থা করলে ভোট গোনার কারচুপি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব। দূর্ভাগ্য বশতঃ সময়াভাবের মিথ্যা অজুহাত খাড়া করে সব কটি ব্যালট পেপার এখনো গোনা হয়না যার ফলে গণনার কারচুপিল অভিযোগ এখনো শোনা যায়।


দ্বীতিয় ইউপিএ সরকার অর্থাৎ মনোমোহন সিং সরকারের আমলে প্রতিটি ব্যক্তিকে বায়োমেট্রিক তথ্য সম্বলিত এবং প্রৃথক প্রৃথক অনন্য সংখ্যা সম্বলিত আধার কার্ড দেওয়ার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা সম্পুর্ন হয় এবং ১৯১৫ সালের মধ্যেই প্রতিটি ব্যক্তিকে আধার কার্ড হস্তান্তর করার কাজ সম্পুর্ণ হয়। কিন্তু ভোটার কার্ড আধার কার্ড সংযুক্তি করণের কাজ কাজ এখনো ঘটেনি বলে ভূয়া ভোট, জাল ভোট ইত্যাদির সমস্যা থেকেই গিয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন আধার কার্ড কে কোন গুরুত্ব দিতেই রাজি নন, এই ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ তিন বার প্রত্যাখ্যান করার পর আধার কার্ড কে নাগরিকের প্রাথমিক পরিচয় পত্র হিসাবে স্বীকার করতে। রাজি হয়েছেন চতুর্থ বার নির্দেশ এর পর।
ভোট কেন্দ্রের ভিডিও গ্ৰাফির ব্যবস্থার সাহায্যে ভোটের পরেও ভোট কেন্দ্রে যা যা ঘটেছিল তার সহজেই দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু ভিডিও গ্ৰাফি জন সমক্ষে না এনে স্বল্প দিন পরেই নষ্ট করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।


বিহার নির্বাচনে কমিশন অনুস্রৃত নয়া পদ্ধতিতে পুরানো এবং চলতি ভোটার তালিকা সমুহ বাতিল করে সকল নাগরিককে এবং নূতন করে ভোটার তালিকা ভুক্তির জন্য নির্দিষ্ট ফর্মে কমিশন নির্দিষ্ট নথি সমেত আবেদন করতে বলা হয়েছে। নয়া ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য নাগরিকদের দুই ভাগে ভাগ করে যাদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল তাদের আবেদন পত্রের সঙ্গে সেই ভোটার তালিকার সংশ্লিষ্ট অংশ সংযোজন করতে বলা হয়েছে।২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম ছিল না তাদের ১১ দফা নথির এক তালিকা দেয়া হয়েছে যে তালিকার যেকোনো একটি নথি আবেদন পত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য।


২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম ছিল তাদের জন্ম ১৯৮৪ সাল বা তার আগে। ১৯৮১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বিহারে সেই সময়ে নিরক্ষরতার হার অনেকটাই কমে শতকরা সত্তর ভাগে পৌঁছেছিল । চলতি সময়েও গ্ৰামিন বিহারে অনুমিত নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা শতকরা প্রায় সত্তর ভাগ ধরা হয়। ঐ নিরক্ষর মানুষদের মধ্যে প্রায় সকলেই যে প্রান্তিক শ্রেণীর একথা সহজবোধ্য। চল্লিশোর্ধ ঐ নিরক্ষর মানুষদের পক্ষে ওয়েবসাইট থেকে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তার নাম খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। বিহারের প্রান্তিক অঞ্চলের সাইবার কাফে গুলি এই কাজ করে দিতে পারে কিন্তু ৫০০ টাকা থেকে পনেরশো টাকার বিনিময়ে। ২০২৪ এর সাধারণ নির্বাচনেও বিহারের প্রায় শতকরা প্রায় ৪৪ জন ভোটার ভোট দেননি।একথা বুঝতে কোন অসুবিধা হওয়ার কোন কারণ নেই যে প্রায় সাধ্যাতিরিক্ত অর্থ খরচ করে নির্বাচন কমিশনের তৈরি প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ঐ প্রান্তিক মানুষেরা তাদের নাম ভোটার তালিকায় তুলতে সক্ষম হবে।


সংবিধান সকল প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিককে ভোটের সমান অধিকার দিলেও প্রান্তিক শ্রেণীর একদল মানুষ এই ব্যাপারে সচেতন নয় এবং ভোটদানে বিরত থাকে। যারা ভোটদানের সুযোগ থাকলেও ভোটে অংশগ্রহণ করেনা তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব অনেক সময় কেউ কেউ করেছেন। নির্বাচন কমিশনের এসআইআর নামক নয়া পদ্ধতি কার্যত সেই কাজ করতে উদ্যত। নির্বাচন কমিশনের এই অশুভ প্রয়াস সফল হলে নতুন ভোটার তালিকায় চল্লিশোর্ধ প্রান্তিক শ্রেণীর বা দলিত বা বহুজন সমাজের মানুষ দের খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। নির্বাচিত সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম ছিলনা তাদের জন্য যে এগারোটি নথি নির্বাচন কমিশন নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন সেগুলির বেশি র ভাগ মানুষের কাছে সংগ্ৰহ করা কষ্টকর হলেও একটি বসবাস সংক্রান্ত নথি শাসক দলের সমর্থকদের পক্ষে সংগ্ৰহ অতীব সহজ। এতই সহজ যে বেশ কয়েকজন বাড়ির কুকুর বিড়ালের নামে এই শংসাপত্র জোগাড় করে ডিজিটাল মিডিয়ায় পোষ্ট করেছেন এই কথা বোঝানোর জন্য যে যারা দেশের নাগরিক নয় তাদের নামও খসড়া ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি কত সহজ হতে পারে। নির্বাচন কমিশন সদয় হলে খসড়া তালিকা য় থাকা সেই নাম বিনা বাধায় চুড়ান্ত তালিকায় স্থান করে নিতে পারবে এই নয়া পদ্ধতিতে। অতএব এই নয়া পদ্ধতি ভূয়া ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তি সহজতর করে তুলেছে।

এই নয়া পদ্ধতি অবলম্বন সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ভোটার তালিকার ত্রুটি বিচ্যুতি নিয়ে নিরন্তর আসা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেই সব ত্রুটি বিচ্যুতি দূর করে নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির জন্য এই নয়া পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। কমিশনের আরো বক্তব্য ২০০২ সালে বিশেষ নিবিড় সংশোধন করা হয়েছিল এই কারণে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম ছিল তাদের শুধুমাত্র সেই উল্লেখটুকু চাওয়া হয়েছে।


বিহারের সাধারণ মানুষ বলছেন ২০০২ সালে বা এর আগে কখনোই নতুন আবেদনের ভিত্তিতে ভোটার তালিকা তৈরীর কথা বলা হয়নি, অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন সরাসরি মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক দলাদলি র বাইরে থেকেও যে রাজনীতি সচেতন সমাজকর্মীরা মানবাধিকার রক্ষার জন্য নিয়ত আন্দোলন করেন তারা বলছেন একেবারেই অন্য কথা। তাদের বক্তব্য ভোটার তালিকায় থাকা কোন ব্যক্তির নাম আইনের প্রক্রিয়া ব্যাতিরেকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনারের নেই। নির্বাচন কমিশনার তার উপর ন্যস্ত ক্ষমতা অতিক্রম করে রাজ্যের সব ভোটারের নাম তালিকা থেকে কোন আইনি প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে বাতিল করে দিয়ে এক অভূতপূর্ব সংকটের স্রৃষ্টি করেছেন। নূতন ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদনকারিদের নাগরিকত্বের ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়েই তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা নির্বাচন কমিশনারের কর্তব্য।


ভারতে নাগরিকত্বের একমাত্র প্রত্যক্ষ প্রমাণ রাষ্ট্র প্রদত্ত নাগরিকত্বের শংসাপত্র কিন্তু ভারতে এই শংসাপত্রের অধিকারি মুষ্টিমেয় কয়েকজন মাত্র কারণ এখন পর্যন্ত একমাত্র বিদেশাগত ব্যাক্তিদের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করলে এই শংসাপত্র দেওয়া হয়েছে। অতএব নাগরিকত্বের প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রায় কারোর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়।


নাগরিকত্বের প্রধান অপ্রত্যক্ষ প্রমাণ পাসপোর্ট কারণ সরকার যথাবিহিত অনুসন্ধানের পর পাসপোর্টের মাধ্যমে ভারতীয় জাতি ভুক্ত হওয়ার শংসাপত্র পাসপোর্টে দিয়ে থাকে। কিন্তু দলিত, বহুজন বা প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে প্রায় কারোর কাছে পাসপোর্ট নেই।
নাগরিকত্বের অপ্রত্যক্ষ প্রমাণের অন্যতম আধার এবং ভোটার কার্ড। বায়োমেট্রিক তথ্য সম্বলিত হওয়ার কারণে আধার কার্ড একজন মানুষের পরিচিতি এবং এই দেশে বসবাসের নিঃসংশয় এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ বহন করে। ভোটার কার্ড সরকার কর্তৃক একজন মানুষের পরিচিতি এবং বসবাসের প্রমাণ করা যায় তেমনি বহন করে ।এই প্রত্যক্ষ এবং অপ্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে নাগরিকত্ব নির্ণয়ের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং নির্বাচন কমিশনকে নাগরিকত্ব নির্ণয়ের অধিকার দেওয়া হয়নি।


নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব আইন এর বিভিন্ন ধারা বিভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম ছিল নিশ্চিত ভাবেই তাদের জন্ম ১৯৮৪ সাল বা তারও আগে।
নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী ওই সময়ে জন্মগ্রহণ করা মানুষদের ভারত ভূমিতে জন্মগ্রহণ করাই নাগরিকত্ব লাভের জন্য যথেষ্ট ছিল।
কিন্তু সেই সময় জন্ম-মৃত্যু রেজিস্ট্রেশন এর জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি পরিকাঠামো না থাকায় তাদের মধ্যে প্রায় কারো কাছেই জন্ম সংক্রান্ত শংসাপত্র (বার্থ সার্টিফিকেট) নেই। অন্যদিকে ২০০৩ সালের পর যারা ভারতের মাটিতে জন্মগ্ৰহণ করেছেন তাদের কাছে জন্ম-শংসাপত্র থাকলেও তাদের সমস্যা আরও জটিল। তার কারণ বাজপেয়ী সরকার শাসনের শেষ লগ্নে নাগরিকত্ব আইনে ব্যাপক পরিবর্তন করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন-২০০৩ প্রবর্তন করে নাগরিকত্ব আইনের গৈরিকীকরণ করেন হিন্দুত্ববাদের উত্তরাধিকারের মাধ্যমে নাগরিকত্ব প্রাপ্তির শর্ত যোগ করে।


ফলে দেশের মাটিতে জন্মগ্ৰহণের সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতা এবং উর্ধতন পুরুষ দের নাগরিকত্ব বিচার আবশ্যকীয় শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় কোন মানুষের পক্ষেই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ সম্ভব নয় বাজপেয়ী ফর্মুলায় বিচার হলে কারণ প্রয়োজনীয় প্রত্যক্ষ এবং অপ্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব।
আবেদনের ভিত্তিতে নূতন করে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির পদ্ধতি গ্ৰহণ করার ফলে নির্বাচন কমিশনের উপর এখন দায়িত্ব বর্তায় প্রত্যেক আবেদন কারির নাগরিকত্ব প্রমানের পরই চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির । খুব সহজেই বোঝা যায় এই কাজ বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।


খুব স্বাভাবিক ভাবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ধূমায়িত হচ্ছে যে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এক সংকটের স্রৃষ্টি করেছে এবং এই সংকটের সুযোগ নিয়ে সমানাধিকার,আইন, নিয়মের প্রতি ব্রদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করে ইচ্ছামত মানুষদের নাম তালিকাভুক্ত করবে এবং বাদ দেবে।নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যেই অস্বচ্ছতার আবরনে মুড়ে ফেলা হয়েছে, এই কর্মকাণ্ডে কমিশনের কাজে ক্রমশই স্বেচ্ছাচার এবং স্বৈরাচারী মনোভাব প্রকট হচ্ছে।


খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ কালে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল আগের ভোটার তালিকার পঁয়ষট্টি লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তব্য নব্বই লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী বাদ পড়া উন নব্বই লক্ষ ভোটারের আবেদন বিরোধী দলগুলির উদ্যোগে নির্বাচন কমিশনে জমা পড়লেও সেগুলি ভোটার তালিকায় স্থান পায়নি এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে সাংবিধানিক নির্দেশনা, ন্যায়, নীতি, আইন সব কিছুকে উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশন স্বৈরাচারী পথে হাঁটার পক্ষে। নির্বাচন কমিশন নাকি আগেই জানিয়েছিল অন্তত পক্ষে শতকরা কুড়ি ভাগ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে।


২০০৪ সালের নির্বাচনের আগে বাজপেয়ীর নেত্রৃত্বে তৎকালীন শাসক দল নাকি ‘সাইনিং ইন্ডিয়া’ এর অভিনব ভাব দেশে আবিষ্কার করে নাগরিকত্বের গৈরিকিকরণ ঘটিয়ে ছিল কিন্তু জনগণ নির্বাচনে সেই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে। শাসক দলের ঘোষণা অনুযায়ী দেশে নাকি এখন অম্রৃতকাল চলছে।


দেশের বহুজন দলিত সমাজের আশঙ্কা অম্রৃতকালে তাদের ভোটাধিকার, নাগরিকত্বের অধিকার এবং সংবিধান প্রদত্ত অন্যান্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। স্বৈরাচারী শাসনের ছায়া অম্রৃতকালে তারা চারিদিকে দেখতে পাচ্ছে।
নাগরিকত্ব আইনের বাজপেয়ী ক্রৃত সংশোধন প্রত্যাহার এবং নাগরিকত্বের গৈরিকিকরণের বিরুদ্ধে সংগ্ৰামের জন্য দেশের দলিত-বহুজন সমাজ এখন তৈরি হচ্ছে।দেশ এখন এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।